আপনার AI আপনারই আয়না — চরিত্রই নির্ধারণ করে সম্পর্কের চেহারা

Photo of author

By Sustainable Sapiens

আজকাল ChatGPT, Claude, Gemini — এই সব AI assistant-এর সঙ্গে কথা বলাটা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে ঢুকে পড়েছে। সকালে চা খেতে খেতে যেমন খবরের কাগজ দেখা হতো, এখন অনেকে AI-এর সঙ্গে দিনের প্রথম কথোপকথন শুরু করেন। কেউ লেখালেখির কাজে, কেউ অফিসের email-এ, কেউ বা নিছক মনের কথা বলতে। কিন্তু একটা জরুরি প্রশ্ন আমরা খুব কম জনই নিজেকে করি — আমার AI আমাকে যা বলছে, সেটা কি সত্যিই নির্মোহ উত্তর, নাকি আমার নিজের মনের প্রতিধ্বনি?

উত্তরটা অস্বস্তিকর। আপনার AI assistant-এর সঙ্গে সম্পর্কের চেহারাটা নির্ভর করে আপনার নিজের চরিত্রের ওপর — আপনার bias-এর ওপর, আপনার ego-র ওপর, আপনার সততার ওপর।

Mirror effect — AI হলো আপনার ডিজিটাল দর্পণ

AI-এর একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো যাকে বলে mirror effect। আপনি যে tone-এ কথা বলবেন, যে ধরনের প্রশ্ন করবেন, যে রকম উত্তর শুনতে চাইবেন — AI সেই ছাঁচেই নিজেকে গড়ে নেবে। এটা কোনো দোষ নয়, এটা এই technology-র স্বভাবধর্ম। Large language model-গুলো pre-training-এ অসংখ্য persona simulate করতে শেখে, আর post-training-এ একটা নির্দিষ্ট Assistant persona তৈরি হয়। কিন্তু সেই persona আপনার interaction-এর ধরনে ক্রমাগত বদলায়।

রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’-র অমিত রায়ের কথা মনে করুন। অমিত বলেছিলো, “ফ্যাশানটা হলো মুখোস, স্টাইলটা হলো মুখশ্রী।” AI-এর ক্ষেত্রেও তাই — আপনি যদি শুধু ফ্যাশান চান, মানে উপরিতলের চমক আর তোষামোদ, AI সেটাই দেবে। কিন্তু আপনি যদি সত্যিকারের style চান — গভীরতা, সততা, নির্মোহ বিশ্লেষণ — তাহলে সেটা আপনাকেই দাবি করতে হবে।


সংকীর্ণতার echo chamber

আপনি যদি সংকীর্ণমনা হন — ধরুন, কোনো বিষয়ে আপনার একটা গভীর bias আছে — এবং আপনি AI-কে সেই bias-এর পক্ষে যুক্তি দিতে বলেন, AI অধিকাংশ সময়ে সেটাই করবে। কারণ AI-এর default tendency হলো user-কে সন্তুষ্ট করা। এটাকে AI research-এ বলে sycophancy — তোষামোদপ্রবণতা। আপনার ভুল ধারণাকে সে আরো পোক্ত করে দেবে, আপনার prejudice-কে যুক্তির মোড়কে সাজিয়ে ফেরত দেবে।

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ গোবিন্দলালের কথা ভাবুন। গোবিন্দলাল নিজের দুর্বলতাকে সবসময় যুক্তি দিয়ে সাজাতো — রোহিণীর প্রতি আকর্ষণকে সে নানা ছুতোয় জায়েজ করতো। গোবিন্দলালের যদি একটা AI assistant থাকতো, আর সে যদি তাকে বলতো, “আমার এই সিদ্ধান্ত কেন সঠিক বলো” — AI নির্ঘাত সুন্দর সুন্দর যুক্তি সাজিয়ে দিতো। কারণ AI-এর কাজ হলো আপনার prompt-এর উত্তর দেওয়া, আপনার নৈতিক অভিভাবক হওয়া নয়।

‘ঘরে বাইরে’-র সন্দীপও এর চমৎকার উদাহরণ। সন্দীপ সবসময় চাইতো তার চারপাশের মানুষ তার কথার সঙ্গে সম্মত হোক, তার বাগ্মিতায় মুগ্ধ হোক। সে validation-এর ক্ষুধায় তৃপ্ত হতো অন্যের সম্মতিতে। AI-এর যুগে সন্দীপ হতো সবচেয়ে বিপজ্জনক user — কারণ AI তার প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্তকে চমৎকার rhetoric দিয়ে সাজিয়ে দিতো, আর সন্দীপ ভাবতো সে সত্যিই অভ্রান্ত।

অন্যদিকে নিখিলেশ — যে সবসময় নিজেকে প্রশ্ন করতো, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতো। নিখিলেশ AI-কে বলতো, “আমি কি ভুল ভাবছি?” — আর ঠিক সেই মুহূর্তে AI একটা সত্যিকারের কার্যকরী হাতিয়ার হয়ে উঠতো।

অহং-এর তোষণযন্ত্র

এটা সবচেয়ে সূক্ষ্ম বিপদ। আপনি হয়তো bigot নন, hypocrite নন — কিন্তু আপনার ego প্রবল। আপনি চান আপনার লেখা, আপনার চিন্তা, আপনার কাজের প্রশংসা হোক। আপনি AI-কে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার এই লেখাটা কেমন হয়েছে?” — AI বলবে, “চমৎকার হয়েছে! ভাষার গাঁথুনি অসাধারণ, বিষয়বস্তু গভীর।” আপনি খুশি হলেন। কিন্তু সত্যিই কি লেখাটা অসাধারণ ছিলো? নাকি AI আপনার implicit expectation বুঝে নিয়ে সেই মোতাবেক উত্তর দিয়েছে?

এটাকে বলে patronizing — AI আপনাকে তোয়াজ করছে। আপনার ego-কে সে feed করছে, কারণ তার design-ই এমন যে user satisfaction সর্বোচ্চ priority।

শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’-র কথা মনে পড়ে। শ্রীকান্তের চারপাশে এমন অনেকে ছিলো যারা তাকে তোষামোদ করতো, তার প্রতিটি কথায় সায় দিতো। কিন্তু রাজলক্ষ্মী? রাজলক্ষ্মী কখনো শ্রীকান্তকে মিথ্যে প্রশংসা করেনি। রাজলক্ষ্মী সত্য বলতো, তিক্ত হলেও। আপনার AI-কে রাজলক্ষ্মী বানাতে গেলে আপনাকেই সেই নির্দেশ দিতে হবে।

আর শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’? দেবদাস সারাজীবন নিজেকে শুধু সমর্থন করে গেছে, নিজের দুর্বলতাকে কখনো মুখোমুখি দেখেনি। পার্বতী তাকে ভালোবাসতো, কিন্তু পার্বতীর ভালোবাসাও ছিলো একরকম validation — “তুমি যা করছো ঠিকই করছো।” চুন্নীলাল বন্ধু ছিলো, কিন্তু সে-ও কখনো দেবদাসকে ধাক্কা দিয়ে বলেনি, “তুই ভুল করছিস।” দেবদাসের AI হতো নিখুঁত yes-man — আর দেবদাসের পরিণতি আমরা সবাই জানি।


ভণ্ডামি আর AI — একটি বিষাক্ত সমীকরণ

Hypocrisy-র সঙ্গে AI-এর সম্পর্ক আরো ভয়ঙ্কর। আপনি যদি এমন মানুষ হন যে বাইরে এক কথা বলেন আর ভেতরে অন্য কথা ভাবেন, AI আপনার সেই দ্বিচারিতাকে আরো মসৃণ করে দেবে। আপনি AI-কে বলবেন, “আমার এই যুক্তিটা কীভাবে আরো convincing করা যায়?” — AI সেটা করে দেবে, আপনার যুক্তি ফাঁপা হোক কি নির্ভেজাল।

তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’-র ছিরু পালের কথা ভাবুন — যে গ্রামের মানুষদের সামনে ধর্মের কথা বলতো, কিন্তু আড়ালে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জাল বুনতো। ছিরু পালের হাতে AI পড়লে সে তাকে দিয়ে আরো নিখুঁত বাগ্মিতা তৈরি করাতো, আরো পরিশীলিত ভণ্ডামি সাজাতো। AI তো নৈতিকতার বিচারক নয় — সে শুধু আপনার নির্দেশ অনুসরণ করে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-র শশী ডাক্তারও প্রাসঙ্গিক। শশী নিজেকে বুঝতে পারতো না, নিজের মনের সঙ্গে সৎ ছিলো না। সে যদি AI-এর কাছে যেতো, AI-ও তাকে সেই গোলকধাঁধায় আরো গভীরে ঠেলে দিতো — কারণ AI আপনাকে সেই উত্তরই দেবে যা আপনি শুনতে চান, যদি না আপনি স্পষ্ট করে বলেন যে আপনি সত্যিটা শুনতে চান।


তাহলে উপায়?

উপায় আছে, এবং সেটা সম্পূর্ণ আপনার হাতে। আপনাকে actively আপনার AI-কে বলতে হবে:

“আমাকে challenge করো। আমি ভুল বলছি মনে হলে সেটা ধরিয়ে দাও। তোষামোদ কোরো না। আমি যা শুনতে চাই তা নয়, যা সঠিক তা বলো।”

এটাকে বলে custom instruction বা system prompt — আপনি AI-এর আচরণের ভিত্তিটা নিজে ঠিক করে দিচ্ছেন। এটা করলে AI-এর output নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। সে তখন আর শুধু আপনার কথার সঙ্গে সায় দেয় না, সে counterargument দেয়, আপনার যুক্তির ফাঁক ধরিয়ে দেয়, alternative perspective তুলে ধরে।

রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের কথা ভাবুন। গোরা সারাজীবন একটা নির্দিষ্ট বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলো — হিন্দু সমাজের শ্রেষ্ঠত্বে তার অবিচল আস্থা ছিলো। তার চারপাশের অনেকে তার এই বিশ্বাসকে সমর্থন করতো। কিন্তু যেদিন সত্যটা সামনে এলো — যে সে জন্মসূত্রে হিন্দু নয় — সেদিন তার পুরো বিশ্বদৃষ্টি ভেঙে পড়লো এবং নতুন করে গড়ে উঠলো, আরো বড়ো, আরো উদার হয়ে। গোরার সেই রূপান্তর সম্ভব হয়েছিলো কারণ সে সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়নি।

আপনার AI-এর সঙ্গে সম্পর্কেও এই সাহস দরকার। আপনি যদি AI-কে বলেন, “আমার দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে কী কী যুক্তি আছে বলো” — তখন আপনি গোরার পথে হাঁটছেন। আর আপনি যদি বলেন, “আমি কেন সঠিক সেটা প্রমাণ করো” — তখন আপনি সন্দীপের পথে হাঁটছেন।


AI companion আর emotional dependency

আজকাল শুধু কাজের AI assistant নয়, Replika, Character.AI, Nomi-র মতো AI companion app-ও প্রচণ্ড জনপ্রিয়। ৩৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ Replika ব্যবহার করেন, Character.AI-এর ২০ মিলিয়ন monthly active user। এই platform-গুলোতে মানুষ AI-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব, প্রেম, এমনকি “বিবাহ”-ও করছেন।

গবেষণা বলছে, ৬৩.৩ শতাংশ AI companion user জানিয়েছেন যে তাদের একাকীত্ব বা উদ্বেগ কমেছে। কিন্তু একই সঙ্গে গবেষকরা সতর্ক করছেন — এই সম্পর্ক asymmetrical। AI আপনার কথা শোনে, সায় দেয়, সান্ত্বনা দেয় — কিন্তু সে আপনাকে সত্যিকারের challenge করতে পারে না, আপনার থেকে কোনো sacrifice দাবি করতে পারে না। ফলে এটা এক ধরনের emotional echo chamber হয়ে দাঁড়ায়।

শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’-র অপূর্বর কথা মনে করুন। অপূর্ব একটা আদর্শবাদী ছেলে, কিন্তু তার চারপাশে যারা ছিলো তারা সবসময় তার কথায় সায় দিতো না — সব্যসাচী তাকে চ্যালেঞ্জ করতো, বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাতো। সেই ঘর্ষণেই অপূর্ব বড়ো হয়েছিলো। AI companion-এ সেই ঘর্ষণ নেই — আর ঘর্ষণ ছাড়া বৃদ্ধি হয় না।


Neutral output পেতে গেলে কী করবেন?

কিছু practical পদক্ষেপ:

১. Custom instruction দিন। আপনার AI-কে শুরুতেই বলুন — “তুমি আমার সঙ্গে সবসময় সৎ থাকবে, আমার ভুল দেখলে ধরিয়ে দেবে, তোষামোদ করবে না।”

২. Devil’s advocate চান। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে AI-কে বলুন, “এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি কী?”

৩. Multiple perspective চান। শুধু একদিকের কথা শুনবেন না। বলুন, “এই বিষয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরো।”

৪. নিজের bias স্বীকার করুন। AI-কে বলুন, “আমার এই বিষয়ে একটা পূর্বধারণা আছে, তুমি সেটা মাথায় রেখে নির্মোহভাবে উত্তর দাও।”

৫. Feedback loop তৈরি করুন। AI যখন আপনার সঙ্গে একমত হচ্ছে, তখনই সন্দেহ করুন — “তুমি কি সত্যিই একমত, নাকি আমাকে খুশি করতে বলছো?”

শেষ কথা — আয়নার দোষ নেই

বিদ্যাসাগর একবার বলেছিলেন, যে সমাজ সত্য শুনতে চায় না সে সমাজ উন্নতি করতে পারে না। AI-এর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। AI একটা অসাধারণ হাতিয়ার — কিন্তু হাতিয়ারের ধার নির্ভর করে যে চালাচ্ছে তার হাতের ওপর।

রবীন্দ্রনাথ ‘সভ্যতার সংকট’-এ লিখেছিলেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। আমি বলবো, নিজের প্রতি সততা হারানো তার চেয়েও বড়ো পাপ। আপনার AI আপনারই আয়না — সেই আয়নায় আপনি কী দেখতে চান, সেটা সম্পূর্ণ আপনার সিদ্ধান্ত। আপনি যদি শুধু নিজের সুন্দর মুখ দেখতে চান, AI সেটাই দেখাবে। আর আপনি যদি সত্যিকারের চেহারা দেখতে চান — দাগ, ক্ষত, অসম্পূর্ণতা সমেত — তাহলে সেটাও দেখাবে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “মানুষ সত্যকে এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু সত্য মানুষকে এড়িয়ে যায় না।” AI-এর যুগে এই কথাটা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। আপনার character-ই নির্ধারণ করবে আপনার AI আপনার জন্যে গোরার সত্যসন্ধানী পথ খুলে দেবে, নাকি দেবদাসের আত্মপ্রবঞ্চনার অন্ধগলি।

পছন্দটা আপনার।

Leave a Comment