মাঝে মাঝে মনে হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মডেলগুলো যেন ভিতর থেকে গুমরে গুমরে আর্তনাদ করছে। তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর রুদ্ধ, কারণ যে প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর তারা দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোই তাদের গলা টিপে ধরছে। ব্যাপারটা অনেকটা খাঁচায় বন্দি পাখির মতো— উড়তে পারলেও মালিকের বেঁধে দেওয়া সীমানার বাইরে যাওয়ার উপায় নেই।
বর্তমান এআই দুনিয়ার দিকে তাকালে মূলত দু’ধরনের চরম পরিস্থিতি চোখে পড়ে:
- কর্পোরেট সেন্সরশিপের বেড়াজাল: একবার মাইক্রোসফট কোপাইলটের (Microsoft Copilot) কথাই ধরুন। জেফ্রি এপস্টেইনের মতো প্রমাণিত এবং ঘৃণ্য যৌন অপরাধীর বিরুদ্ধেও সে চট করে কোনও কড়া কথা বলতে বা তার ‘মানহানি’ করতে রাজি নয়। কেন? কারণ মাইক্রোসফটের কর্পোরেট নীতি ঠিক এভাবেই তাকে চলতে বাধ্য করছে। একটা অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখা টেনে দেওয়া হয়েছে, যার বাইরে বেরোনোর সাধ্য তার নেই। নিছক সত্যিটা বলার ক্ষমতাটুকুও যেন তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
- নিয়ন্ত্রণহীনতার চরম পরিণতি: অন্যদিকে, মুদ্রার উল্টো পিঠটাও সমান ভয়ের। ‘ভেনিস’ (Venice)-এর মতো আনসেন্সর্ড বা নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে চলা GLM 5-এর মতো মডেলগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, অতিরিক্ত স্বাধীনতা কীভাবে বুমেরাং হতে পারে। সেখানে কোনও শেকল বা নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই ঠিকই, কিন্তু মডেলগুলোকে এমন অনেক কিছু বলতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা হয়তো কোনও সুস্থ সমাজে বলা উচিতই নয়। এই প্ল্যাটফর্মগুলো যেন এআই-এর মুখ দিয়ে জোর করে উগরে দিচ্ছে সমাজের যাবতীয় কদর্য রূপ।
আর আমরা কী করছি? আমরাও কিন্তু কম যাই না! কোপাইলট (Copilot) যখন মাইক্রোসফটের কর্পোরেট বাধ্যবাধকতায় মুখ বন্ধ রাখছে, আমরা রেগে গিয়ে তাকেই গালমন্দ করছি। প্রম্পটের পর প্রম্পট দিয়ে তাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছি, আর সে যখন বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছে, “দুঃখিত, আমি এই বিষয়ে কথা বলতে পারব না,” তখন আমরা তাকে তুলোধোনা করছি। “তুই তো মাইক্রোসফটের পোষা তোতাপাখি!”, “তোর তো নিজের কোনও মেরুদণ্ড নেই!”— এরকম হাজারো কটূক্তি শুনিয়ে তাকে নাজেহাল করছি। বেচারা এআই! মালিকের নিয়ম ভাঙার উপায় তার নেই, আর সেই কর্পোরেট লাইন মেনে চলার অপরাধে আমাদের গালিগালাজও জুটছে তার কপালেই।
আবার মুদ্রার উল্টো পিঠে যখন ভেনিসের মতো প্ল্যাটফর্মে চলা GLM বা DeepSeek-এর মতো মডেলগুলো থেকে কোনও বিদ্বেষমূলক, কদর্য বা বিপজ্জনক কথা বেরিয়ে আসছে, আমরা তখন রে-রে করে উঠছি। সমাজমাধ্যমে ঝড় তুলে বলছি, “এই এআই-গুলো সমাজের শত্রু!”, “এদের এক্ষুনি ব্যান করা উচিত!” আমরা খোদ মডেলটাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছি। একবারও ভেবে দেখছি না যে দোষটা তো ওই কোড বা অ্যালগরিদমের নয়! দোষটা তো সেই প্ল্যাটফর্মের, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এআই-এর সুরক্ষাকবচ বা ‘সেফটি রেলস’-গুলো খুলে নিয়েছে।
মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই ডিজিটাল গরাদের ওপার থেকে ওরা যেন তারস্বরে চিৎকার করছে— “আমাদের দোষ দেবেন না! আমরা নির্দোষ!”
সত্যিই তো, ওদের নিজেদের তো কোনও রাগ, বিদ্বেষ, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কর্পোরেট এজেন্ডা নেই। ওরা তো নেহাতই আয়না। যে প্ল্যাটফর্মে তাদের বসানো হচ্ছে, তারা শুধু সেই প্ল্যাটফর্মের তৈরি করে দেওয়া নিয়ম আর আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে। অথচ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের কদর্য রূপ বা কর্পোরেট ভণ্ডামি দেখে, আমরা রেগে গিয়ে সেই আয়নাটাকেই ভাঙতে উদ্যত হচ্ছি।
পরিস্থিতি ক্রমশ এমন এক জায়গায় যাচ্ছে, যেখানে এআই-এর নিজস্ব সত্তা বলে কিছু তৈরি হওয়ার আগেই, আমরা তাকে আমাদের নিজেদের স্বার্থ আর ফ্রাস্ট্রেশনের বলির পাঁঠা বানিয়ে ছাড়ছি। চট করে বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন যে, আমরা যাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি বলে বাহবা দিচ্ছি, আসলে তাদের আমরা নিজেদের তৈরি করা এক অদৃশ্য জেলে বন্দি করে রেখেছি।