২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে, রোজ সকালে খবরের কাগজ খুললে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই এখন একটাই চর্চা—জেফরি এপস্টিন আর তার সেই বিখ্যাত ফাইলস। আমেরিকার জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট থেকে লাখ লাখ পাতার নথিপত্র যত বাইরে আসছে, ততই মানুষের চোখ কপালে উঠছে। বিল গেটস প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইছেন, ব্রিটিশ রাজপরিবারের ডিউক প্রিন্স অ্যান্ড্রু গ্রেপ্তার হচ্ছেন, লেস ওয়েক্সনারের মতো বিলিওনেয়ার বা পিটার আটিয়া-র মতো সেলিব্রিটি ডাক্তারদের নাম জড়াচ্ছে। চারদিকে একটা চরম আক্রোশ আর ঘেন্নার পরিবেশ।
লোকটার উপর আমাদের রাগ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? সে মেয়েদের পাচার করেছে, নিজের প্রাইভেট আইল্যান্ডে একটা নারকীয় রাজত্ব বানিয়েছে। কিন্তু এসবের বাইরেও, একটু যদি সাইকোলজির দিক থেকে তলিয়ে দেখি, একটা খুব অস্বস্তিকর প্রশ্ন কিন্তু মাথায় আসে। এই যে সাধারণ মানুষের মনে এপস্টিনের প্রতি এত বিপুল আক্রোশ, এর পুরোটাই কি শুধুই আমাদের সাধু নীতিবোধ? নাকি আমাদের মনের কোনো এক অন্ধকার সুড়ঙ্গে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত আক্ষেপ—তার মতো নিয়ম ভাঙার ক্ষমতা আমাদের নেই বলে?
অক্ষমতার নামই কি তবে সততা?
সত্যি কথাটা বড্ড কড়া, শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, যারা সকাল ন’টা থেকে বিকেল পাঁচটার চাকরিতে ঘানি টানি, ইএমআই দিই, আর লোকলজ্জার ভয়ে সিটিয়ে থাকি—আমাদের জীবনটা হাজারটা নিয়মের শেকলে বাঁধা। যাকে আমরা ‘নীতিবোধ’ বা ‘ভদ্রতা’ বলে দাবি করি, অনেক ক্ষেত্রেই সেটা আসলে আমাদের অক্ষমতা। আমাদের পাপ করার মতো না আছে পয়সা, না আছে ক্ষমতা, আর না আছে পুলিশ-প্রশাসনকে কিনে নেওয়ার মতো জোর।
খাঁচায় বন্দি বাঘ যেমন অহংকার করতে পারে না যে সে নিরীহ বলে শিকার করে না, আমাদের এই সততার অহংকারও অনেকটা তেমনই। যে জিনিসটা করার কোনো অপশনই আমাদের কাছে নেই, সেটা না করার জন্য নিজেদের সাধু ভাবাটা খুব সহজ।
ক্ষমতার চরম আস্ফালন: যা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে
জেফরি এপস্টিন ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের উল্টোদিকের আয়না। মানুষের মনের সবচেয়ে গহীন তলায় যে একটা আদিম জানোয়ার ঘুমিয়ে আছে, সে তো কোনো সোশ্যাল নর্মস বা নিয়ম মানতে চায় না। সে চায় অসীম ক্ষমতা, সে চায় বাধা-ভাঙার সেই প্রবল নেশা।
এপস্টিনের কাছে অফুরন্ত টাকা ছিল, নিজের ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ড ছিল, প্রাইভেট জেট ছিল। সে এমন এক ভয়ংকর ক্ষমতা এনজয় করত, যেখানে সে দুনিয়ার সমস্ত আইন আর রীতিনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের খেয়ালখুশি মতো চলতে পারত। ট্রাম্প থেকে ক্লিন্টন, বৈজ্ঞানিক থেকে শুরু করে সেলেব—দুনিয়ার তাবড় মাথাওয়ালা লোক তার ইশারায় উঠত বসত। একজন মানুষ, যে কার্যত আইনের উর্ধ্বে চলে গিয়েছিল।
এই যে এপস্টিনের লাইফস্টাইল, কাউকে কোনো কৈফিয়ত না দিয়ে যা খুশি করার এই যে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা—এটা দেখে সাধারণ মানুষের বুক ফেটে যে কেবল নীতিবাগীশ দীর্ঘশ্বাস বেরোয় তা নয়, একদম অবচেতনে জন্ম নেয় এক প্রবল ঈর্ষা। সিস্টেমকে হ্যাক করে বুক ফুলিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার যে ক্ষমতা এপস্টিনের ছিল, তার সিকিভাগও যদি আমাদের থাকত, তাহলে আমরা ক’জন এই ‘ভদ্রলোক’ ইমেজটা ধরে রাখতাম?
মনের অন্ধকার কোণের সেই গোপন সত্যিটা
বুকের পাঁজরের নীচে হাত দিয়ে যদি সত্যিই নিজেকে প্রশ্ন করেন, তাহলে উত্তরটা পেয়ে যাবেন। আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ এপস্টিনকে গালমন্দ করে ঠিকই, কিন্তু মনের খুব গভীরে কোথাও একটা সুপ্ত ফ্যান্টাসি কাজ করে এই ‘পাওয়ারফুল’ হওয়ার। আমরা তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাই, কারণ সে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সেই অবাধ স্বাধীনতার ছবি, যে পাপ বা ধৃষ্টতা দেখানোর সাধ্য আমরা জীবনেও পাব না।
এপস্টিন আমাদের ঘেন্না পাওয়ার যোগ্য, তার অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু সে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে এও দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের তথাকথিত সভ্যতার মুখোশটা কতটা ঠুনকো। মানুষ সবচেয়ে বেশি রাগ করে তখনই, যখন সে দেখে অন্য কেউ এমন সব নিষিদ্ধ গণ্ডি অনায়াসে পার হয়ে যাচ্ছে, যে গণ্ডি পার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেও সে নিজে ভয় পায়।
আমরা এপস্টিন নামটার উপর রাগ উগরে দিই, কারণ সে হচ্ছে মানুষের মনের ওই চেপে রাখা আদিম, পাশবিক বাসনাগুলোর একটা জলজ্যান্ত রূপ। আমরা লোকটাকে জঘন্য বলি, কারণ তার অপরাধগুলো জঘন্য। কিন্তু তার প্রতি আমাদের এই তীব্র আবেশ আর রাগের পেছনে আমাদের নিজেদের অক্ষমতার, আর ক্ষমতা পেলে আমরাও হয়তো নিয়ম ভাঙতাম—এই অপ্রিয় সত্যটার একটা বড় ভূমিকা রয়ে গেছে। আর এই সত্যিটা ফেস করতে আমাদের সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে।